নেত্রকোনার খ্যাত মিনি কক্সবাজার উচিতপুর হাওর

নেত্রকোনা প্রতিনিধি :

0
95

আমাদের এই বাংলাদেশে রয়েছে অনেক পর্যটনস্থল যার বেশীরভাগই এখনো আমাদের কাছে অজানা অচেনারূপে অদৃশ্য হয়ে আছে।
ভ্রমণপিয়াসু অনেকেই একঘেয়ে পর্যটন জীবন থেকে বাইরে আসতে নতুনত্ব খুজে পেতে বের করে বাংলাদেশের লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন পর্যটন স্থানকে, যা ভোরের উদয় হওয়া সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বল করে তুলে আমাদের বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প কে।

নান্দনিক ও নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠা এমনি এক সম্ভাবনার পর্যটন স্থান হলো নেত্রকোনার মদন উপজেলার উচিতপুর হাওর, যা পর্যটকদের কাছে মিনি কক্সবাজার হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে।

একপাশে বালুকণা অন্য পাশে যতদূর চোখ চায় শুধু পানি আর পানি এমন দৃশ্য শুধু বাংলাদেশে চোখে পড়ে সমুদ্র সৈকতেই কিন্তু যতদূর চোখ যায় পানি আর পানিতে বিস্তৃত প্রান্তরের দ্বিতীয় দৃশ্যটি হয়ত চোখে পড়বে না এই উচিতপুর হাওরে।

মূলত হাওর হলো বন্যা প্রতিরোধের জন্য নদী তীরে নির্মিত মাটির বাঁধের মধ্যে প্রায় গোলাকৃতি নিচুভূমি বা জলাভূমি, তবে হাওর সব সময় নদী তীরবর্তী নির্মিত বাঁধের মধ্যে নাও থাকতে পারে। উচিতপুর হলো এমনি একটি হাওর যার সৌন্দর্য মূলত জেগে উঠে শুধুমাত্র বর্ষাকালে, প্রতি বছরই মৌসুমী বর্ষায় বা স্বাভাবিক বন্যায় এই হাওর প্লাবিত হয়, বছরের কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং বর্ষা শেষে হাওরের গভীরে পানিতে বা জলে নিমজ্জিত কিছু স্থায়ী বিল জেগে উঠে। গ্রীষ্মকালে এই হাওরকে সাধারণত বিশাল মাঠের মতো মনে হয়, যেখানে তখন চলে স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদ, কিন্তু বর্ষাকালে যেনো এই মাঠ হয়ে উঠে পানিতে বিস্তৃত এক সমুদ্র সৈকত রূপে।

মিনি কক্সবাজার খ্যাত এই উচিতপুর হাওরে আসতে হলে প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে বালিশ মিষ্টির দেশ নেত্রকোনা শহরে, তারপর আপনাকে যেতে হবে নেত্রকোনা জেলা সদর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত মদন উপজেলা সদরে, মদন উপজেলা থেকে মাত্র চার কিলোমিটার পূর্ব দিকে এগোলেই আপনি পৌছে যাবেন উচিতপুরের হাওরে।
নেত্রকোনা জেলা শহর থেকে আপনি অনায়াসে চলে যেতে পারবেন মদন উপজেলায়, তারপর সেখান থেকে আপনাকে বাস অটোরিক্সা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে যেতে হবে উচিতপুরে এর জন্য আপনার ঘড়ির কাটা হতে চলে যাবে দেড়ঘন্টা সময়।

নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত এই উচিতপুর হাওড়, যেখানে গেলে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে বালই নামক ব্রিজের দুই প্রান্তে প্রায় দুই কিলোমিটার ডুবন্ত সড়ক, যা এই এলাকার সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠে পর্যটকদের কাছে, হাটু পর্যন্ত ডুবন্ত এই সড়কে অবস্থান নিতে হয় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের এখানে দাড়িয়েই উপভোগ করতে হয় হাওরের মূল সৌন্দর্যকে।

পিচঢালা রাজপথ দেখতে অভ্যস্ত আমরা সেখানে হাটতে গেলে দুর্ঘটনার ভয়, যানবাহনের পিষ্টে পড়ার ভয় আমাদের নিয়মিত তাড়া দেয় কিন্তু উচিতপুরের এই সড়ক যেনো একটু ব্যাতিক্রম পর্যটকদের কাছে, পানির নিচে পিচঢালা পথ আর পানিতে দাঁড়িয়ে শুধু রাস্তার পাশের খুটি গুলোকে ভরসা করে দুই পাশে থৈথৈ পানি নিয়ে হেটে চলার প্রশান্তি শুধু আপনাকে দিবে এই উচিতপুর হাওরেই।

পানিতে দাঁড়িয়ে কিংবা কখনো হেটে হেটে আপনার ঘুরতে আসা সময়টুকুতে আরো একটু রোমাঞ্চকর করে তুলবে মাঝে মাঝে হাওর হতে আসা ঢেউ গুলো, যা এখানে দাড়িয়ে আপনাকে কল্পনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্র সৈকতে দাড়িয়ে থাকার অনুভূতির মাঝে, এছাড়াও পানিতে দাড়িয়ে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করার আনন্দ আপনাকে যতটা মুগ্ধ করবে ততটাই আপনি উপভোগ করবেন জলরাশির ওপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখে, যা দেখতে বর্ষায় এখানে ভীড় জমায় কাছে ও দূর হতে আসা অনেক দর্শনার্থীরাই।

উচিতপুর হাওরের জলসমুদ্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে কিংবা জলরাশির উপর পরিবার প্রিয়জন নিয়ে কিছুটা সময় ভেসে থাকতে আপনাকে ভাড়া করতে হবে নৌকা কিংবা ট্রলার, নৌকা কিংবা ট্রলারের ভাড়া দিতে আপনাকে ঘন্টায় গুনতে হবে টাকা।

হাওরে ঘুরতে এসে যদি আপনি জলরাশির সাথে নিজের একটু ঘনিষ্টতা বাড়াতে পানিতে নেমে পরেন কিংবা সাতার দিতে বন্ধু বান্ধব দলবল নিয়ে নেমে যান হাওরের পানিতে তবে আপনাকে হতে হবে একটু সতর্ক, সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে কারন হাওরে প্রবল বাতাসে বড় বড় ঢেউয়ের সৃষ্টি হতে পারে,যা থেকে হতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা।

দূর দুরান্ত হতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য এই উচিতপুর হাওরে আসার পর থাকতে হবে একটু তাড়া কারন এখানে নেই রেস্ট রুম, খাওয়ার পানি, বসার জায়গা কিংবা খাবার হোটেল, সারা দিন ঘুরেফিরে রাত্রে থাকার জন্য আপনাকে যেতে হবে মদন উপজেলা কিংবা নেত্রকোনা সদরে কোন আবাসিক হোটেলের সন্ধানে।

“যখন তুমি সমুদ্র দেখনি, বন্যার জল দেখে বলেছিলে নাবিক এই বুঝি তোমার সমুদ্র?
আমি বলেছিলাম ধূর বোকা সমুদ্র সে তো নীল নোনা জলের সীমাহীন আধার”

কবির ভাষার সাথে হয়ত কিছুটা সামঞ্জস্য আনে সমুদ্র আর উচিতপুরের মাঝে কিন্তু যখন উচিতপুর হাওরে দাঁড়িয়ে আপনি চারিপাশে জলারাশী পানে মুগ্ধতা নিয়ে তাকাবেন তখন আপনার সমুদ্র স্নানের স্বপ্ন কিছুটা হলেও পূরণ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here