বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে ভাটার টান!

0
410


দুই দশকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিলো বর্তমানে সেই সম্পর্কে ভাটা পড়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে জামায়াতের সক্রিয় অংশ গ্রহণ না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থতি এমন হয়েছে যে ২০ দলীয় জোট এখনো অক্ষুন্ন রয়েছে দাবি করা হলেও এখন বিএনপির সাথে জামায়াতের জোটগত সম্পর্ক আদৌ রয়েছে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

তবে দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, জোটের অংশগ্রহণমূলক কাজে জামায়াতকে খুব একটা দেখা না গেলেও জোট অটুট রয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর জোটের অন্য শরিকদলগুলোর নেতারা তার মুক্তি দাবি করে রাজপথে কর্মসূচিতে অংশ নিলেও জামায়াতে ইসলামী এখনও পর্যন্ত অংশ গ্রহণ করেনি। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন উপ-নির্বাচনে মেয়র পদে জামায়াত-বিএনপি উভয় দলের প্রার্থী থাকায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস ঘনীভূত হয়েছে।

বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, বৃহত্তর রংপুরে জামায়াতের বড় ভোট ব্যাংক থাকলেও বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে পরাজিত হন। অথচ এই বিভাগে জামায়াতের প্রায় অর্ধলক্ষ ভোট রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। জামায়াতের এত ভোট কোথায় গেলো -এ প্রশ্ন ছিল তখন সর্বত্রই।

এরপর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ঘোষণার পরই জামায়াত তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থীই ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী এমন অঙ্গীকার করা হলেও কথা রাখেনি জামায়াত। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তাবিথ আউয়ালের নাম ঘোষণা করা হলেও জামায়াত তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি।

সর্বশেষ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির ডাকা বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে জোটের অন্য শরিকদের উপস্থিতি দেখা গেলেও জামায়াতের কোন নেতাকে দেখা যায়নি। তবে জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি কর্মসুচিতে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুল হালিম হাজিরা দিয়ে চলে গেছেন বলে শোনা গেছে।

জামায়াতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, ‘জামায়াত তার নিজস্ব পলিসিতে (কৌশল) চলছে। তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুচ্ছে তা বলা মুশকিল, কারণ তাদের সাথে যোগাযোগের সব পথই তারা বন্ধ করে রেখেছে।’

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির নীতির কারণে অভিমানে হয়তো জামায়াত তাদের বড় ভোট ব্যাংককে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করেছে। সেজন্য বিএনপির প্রার্থী জামায়াত সমর্থকদের কোন ভোট পাননি।’

জানা গেছে, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশনে ইতিমধ্যে তারা দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জোবায়ের আহমদ নামে এক নেতাকে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করে তার পক্ষে প্রচারণাও শুরু করেছে। এছাড়া গাজীপুর ও রাজশাহীতেও স্থানীয়ভাবে মেয়র পদপ্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে গোপন প্রচার চালানো হচ্ছে। বরিশালসহ বাকি সিটি গুলোতেও এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের কর্মপরিষদের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা জোটে আছি, জোটের মধ্যেই থাকব। তবে সেই থাকাটা মূলত নির্ভর করবে জোট প্রধান খালেদা জিয়া আগামী একাদশ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কী না, সেটার ওপর। তাছাড়া কাজ কখনও থেমে থাকার সুযোগ নেই। সরকারের সীমাহীন নির্যাতনের মধ্যেও আমরা কাজ করেছি। সবসময় মাঠে থেকেছি, এখনও আছি। তবে সেটা ভিন্ন কৌশলে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘জামায়াতের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যেও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তারা স্বার্থের বাহিরে কিছুই করছে না।’

জামায়াতকে ‘নগদ স্বার্থে বিশ্বাসী দল’ উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা আরো বলেন, ‘জামায়াতের সাথে যতটুকু সম্পর্ক রক্ষা করা প্রয়োজনে তাদের ক্ষেত্রে তা-ই করা হচ্ছে।’

স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটি অনেক আগেই আত্মহত্যা করেছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে চাপে রাখার জন্য তারা বিভিন্ন সিটিতে এককভাবে প্রার্থী দেয়ার কৌশল অবলম্বন করছে। স্বার্থের বাহিরে জামায়াত কিছুই চিন্তা করে না। বরং বিতর্কিত এই দলটি বিএনপির অতীতের সব ত্যাগ অস্বীকার করে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে।’

জামায়াত এখনো বিএনপির জোটেই রয়েছে দাবি করে বিএনপির একটি অঙ্গ সংগঠনে শীর্ষ নেতা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বলা যাবে না। বিএনপি নিজের যোগ্যতা বলেই বিগত সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। বিএনপির কারো ভরসায় রাজনীতি করে না। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তা প্রমাণ হয়ে যাবে।’

জামায়াতের অপর একটি সূত্র জানায়, জামায়াত ইসলামী একাদশ নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে দলের নিবন্ধন পাওয়া না পাওয়ার দিকে তাকাচ্ছেন না তারা। দলের নিবন্ধনের জন্য শেষ চেষ্টা করবেন। নিবন্ধন না পেলে প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াবেন প্রার্থীরা। এজন্য নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পেতে আইনি লড়াই শুরু করার কথা ভাবছে জামায়াত।

যদিও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম জানিয়ে দিয়েছেন, ফুলকোর্ট সভায় দাঁড়িপাল্লাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় আইনি লড়াইয়ের কোন সুযোগ নেই জামায়াতের।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৯টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন করলেও তৎকালীন বিএনপি-জোট তাদের সমর্থন দেয় ৩৪টিতে। তবে আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জোটের পরিধি বড় হওয়ায় ও নির্বাচনকালীন সরকার মাথায় রেখে সমর্থিত আসনসংখ্যা কমতে পারে বলে মনে করছেন জোটের অনেকে।

অবশ্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন৷ ফলে দলটির এখন আর দলীয়ভাবে এবং এমনকি নিজস্ব প্রতীক দাড়িপাল্লা ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগও থাকছে না। ফলে রাজনীতিতে এ দলটির বর্তমান অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে৷

গত ২৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার সামনেই জোটের উদ্দেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম বলেছিলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অনেক প্রোপাগান্ডা চলছে। কোনও প্রোপাগান্ডায় কান দেবেন না। আমরা এতদিনে যেহেতু প্রবলেম হয়নি, ইনশাল্লাহ সামনেও হবে না।’ ওইদিন বৈঠকের পর সংবাদকর্মীরা জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল হালিম বলেছিলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে জামায়াত আছে, থাকবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দৃশ্যত ২০ দলীয় জোটের অংশগ্রহণমূলক কাজে খুব একটা দেখা না গেলেও জোটের সমর্থনে আছে জামায়াত ইসলামী। দলটি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। যদিও সাধারণত জামায়াতের সাধারণ কর্মীরা বিএনপির বিগত দিনের কর্মসূচিতে মাঝে মাঝে অংশ নিলেও খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর চোখে পড়ার মতো তাদের সাড়া মেলেনি।’

বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও বলেন, বিএনপির সাথে জামায়াত ইসলামীর আর্দশিক কোন মিল নেই। যে সম্পর্ক আছে সেটা নির্বাচনী জোট, এর বাইরে কিছু নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here