‘রূপ-যৌবনটা ক্ষণিকের’

[ad_1]

বাইরের অনেকের কাছে অভিনয় জগৎ শুধুই চাকচিক্যের। তবে শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটা সর্বাংশে সত্য নয়। এটাও একটা পেশা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও অনেক নারী তারকাকেই এ পথে এলে কটুবাক্যের সম্মুখীন হতে হয়। পরিবার ও সমাজ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে অভিনয়ে যুক্ত নারীদের গতিরোধ করতে। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে অভিনয় ক্যারিয়ারের নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলেন ওই অভিনেত্রী।

নওশাবা বলেন, ‘আমি তো এখনো স্ট্রাগল করছি। আমার কাছে মনে হয় লাইফ ইজ অ্যা স্ট্রাগল। যদি কেউ বলে যে তার স্ট্রাগল শেষ হয়ে গিয়েছে, তার মানে তার শেখা শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি শেখা বন্ধ করতে চাই না। আমার ভেতর কন্টিনিউয়াসলি নিজেকে অতিক্রম করার একটি ইচ্ছা আছে। আমি সুস্থ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী। আমাদের দেশের এখন যে অবস্থা; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কোনো কিছুতেই কোনো শান্তি নেই। মানে মুক্তি নেই।’

‘আমরা খুবই আবদ্ধ একটি জায়গায় আছি। সে কারণে আমি মানসিকভাবে ধরাশায়ী। কিন্তু আমার পক্ষে কখনোই আবদ্ধ থাকা সম্ভব না। আসলে আমার পক্ষে আর্টওয়ার্ক ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব না। এটা আমি জানি। তো এই যে স্ট্রাগলটা, প্রথম স্ট্রাগল তো নিজের সাথে। তারপর হচ্ছে পরিবারের সাথে, তারপর হচ্ছে সমাজের সাথে।’

অভিনয়ে আসার বিষয়ে পরিবারের কোনো বাধা বা সহযোগিতা আছে কি না, জানতে চাইলে ছোট ও বড়পর্দায় অভিনয় করা নওশাবা বলেন, ‘‘অবশ্যই। এখনো বাধা দেয়। তবে তাদের এই বাধাকে কোনোভাবেই খারাপ সেন্সে নিই না। কারণ তারা আমাকে ভালোবাসে। তারা জানে যে, আমি অনেক বেশি আবেগী, আমি অনেক বেশি সেন্সেটিভ। আমার বাবা বলেন, ‘মিডিয়া যেমন তোমাকে এক সেকেন্ডে উপরে উঠিয়ে দিতে পারে, তেমনই দুই সেকেন্ডের মধ্যে মেরে ফেলতে পারে।’ ধরুন আমি এতদিন ধরে স্রোতের বিপরীতে চলে নিজের মতো করে একটি ইমেজ তৈরি করেছি, নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছি। কিন্তু ধরুন আমার একটি ছোট ভুল, আমি তো মানুষ, আমার তো ভুল হতেই পারে। হওয়ার সাথে সাথেই আমাকে একদম কলুষিত করে ফেলবে।’’

‘যেমন ধরুন, শ্রীদেবী। কে শ্রীদেবীর সিনেমা দেখেনি! রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী পর্যন্ত তার নাম জানে; তাই না? কিন্তু তিনি যেদিন মারা গেলেন, তারপর যতগুলো না পজিটিভ নিউজ হলো, তার চেয়ে বেশি নেগেটিভ নিউজ হয়েছে। কেন উনি মদ্যপান করেছেন, এ বিষয়ে লেখা হলো, যারা লিখছেন তারা কি মদ্যপান করেন না? প্রত্যকটা মানুষের জীবনেই উত্থান-পতন রয়েছে। একজন আর্টিস্ট, একজন সংস্কৃতিকর্মীকে মানবিকভাবে নেওয়া এটা আসলে প্র্যাকটিসের ব্যাপার। বাইরের দেশে যখন একজন আর্টিস্ট ডিপ্রেশনে ভোগে, ওরা তাকে সাপোর্ট দেয়। পুরো টিম ধরে। কিন্তু আমাদের দেশে কী হয়? ধরুন একটি মেয়ে খুব ছোট বয়সে মিডিয়ায় এলো, সে অনেকগুলো ভুল করে ফেলল। শেষমেশ তাকে আত্মহত্যা করতে হয়।’

সম্প্রতি ঢাকা অ্যাটাক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয় হয়েছেন এক মেয়ের জননী নওশাবা। একজন নারী অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় অঙ্গনে কোন ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সে প্রসঙ্গে নওশাবা বলেন, ‘আমার পরিবার এখন আমাকে সাইলেন্টলি সাপোর্ট দেয়। কারণ তারা বুঝে গিয়েছে যে, এই মেয়েকে সরানো যাবে না। আমি আসলে একেবারেই অভিনয়ের প্রেমে বুঁদ। তারা আমাকে অনেকভাবে চেষ্টা করেছে, অনেকভাবে বুঝিয়েছে, তারা যেটা করে। তারা আমাকে যেমন উৎসাহ খুব দেয় না, আবার আমার পা টেনেও ধরে না। ভাবে, এ আসলে পাগল।’

‘একে কন্ট্রোল করা যাবে না। আমি তো আমার কাজ আসলেই ভালোবেসে করি। আমার কাজের সংখ্যা খুবই কম। আমি কিন্তু শুধু ফেমের জন্য কাজ করিনি। আমি আসলে আমার মেয়ে ও অভিনয় করা ছাড়া আর কিছু ভালোবাসি না। এ জায়গায় আমি যখন এসে পৌঁছেছি, তখন আমার পরিবার আমার বাবা-মা, তারা বুঝেছে যে কাজটা তো ঠিক আছে। তারা ভেবেছে যে আমি হয়তো অনেক টাকা উপার্জন করতে পারব না, কিন্তু আমার একটা আত্মতৃপ্তি থাকবে। আমি বুঝি যে আমার বাবা-মায়ের কষ্ট হয়। যখন তারা দেখে যে আমি দিনের পর দিন টাকা পাচ্ছি না, টাকা উঠাতে পারছি না। আমার তো মা হিসেবে একটা দায়িত্ব রয়েছে। সেই জায়গা থেকে আমি দুমড়ে-মুচড়ে যাই, ডিপ্রেশনে চলে যাই।’

অভিনয়ে পারিবারিক সমর্থন না থাকায় হয়তো অনেকেই বিষণ্নতায় ভোগে। আত্মহত্যার খবরও উঠে আসে পত্রিকার পাতায়। এ বিষয়ে নওশাবার ভাষ্য, ‘ধরুন, একটি মেয়ে ভুল করেছে। এখন তার মা-ও যদি তার ভুল ধরে, মিডিয়াও তাকে দূর দূর করে, যদি বলে, তুমি তো কলুষিত, তুমি তো কলঙ্কিত, তাহলে মেয়েটি কী করবে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা আত্মহত্যা করে। কয়জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে, আমাকে বলুন তো?’

‘আমি কোনো অনুপাতে যাচ্ছি না। যেটা হয় যে আমাদের নারীদের নিজেদের অবস্থানটা নিজেদের কাছেই রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে পারিবারিক সাপোর্ট প্রয়োজন। যারা ছোট বয়সে আসে মিডিয়ায়, তাদের জন্য আমার আরও বেশি মায়া লাগে। কারণ, তারা কিছু বোঝার আগেই এই অদ্ভুত জগতে এসে পড়ে। এখানে এত রং, এত ক্ল্যাশ! এই রূপের যৌবনটা কিন্তু ক্ষণিকের। ভুল হবেই, ভুলের ঊর্ধ্বে মানুষ নেই। কিন্তু এই যে ডিপ্রেশনে পড়ে মানুষ আত্মহত্যা করছে, সেই সংখ্যাটা কমিয়ে আনা উচিত।’

অভিনেত্রী মেয়েরা সংসারী হয় না- এমন কানাঘুষাও প্রচলিত রয়েছে সমাজে। এ বিষয়ে অভিনেত্রী নওশাবা বলেন, ‘ধরে নেওয়া হয়, অভিনেত্রী মানেই আপনি একজন ভালো মা নন, আপনি একজন ভালো মেয়ে নন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে একজন প্রধান শিক্ষিকা অথবা ব্যাংকের একজন কর্মী, তিনি যেহেতু একজন অভিনেত্রী নন, তার মানেই কি তিনি একজন ভালো মা? আমার কথা হচ্ছে, আমি ভালো মা কিংবা না, সেটার জবাবদিহিতা আমি অন্যের কাছে চাই না। আমি কারো জবাবদিহিতা করবও না। অভিনয় একটা প্রফেশন, এটা শুধুমাত্র পাড়া বেড়ানি নয়।’

অনেক সময় শুটিংয়ের চাপে একজন অভিনেত্রীকে দেরি করে বাসায় ফিরতে হয়। সেটিকেও অনেক সময় ভালো চোখে দেখা হয় না। এ বিষয়ে নওশাবা বলেন, ‘আমি প্রতিদিন সাড়ে ১১টায় যখন ফিরি, তখন যারা আমার ঢাকা অ্যাটাক দেখে অস্থির হয়ে যায়, তারাই আমাকে দেখে বলে এই যে এসেছে। কিন্তু আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী, এটা করে আমাকে অপমান করা হয়। প্রতিদিন এসবের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাকে।’

‘অভিনয় শিল্পী মানেই কি কাড়ি কাড়ি অর্থ উপার্জন?’ উত্তরে নওশাবা বলেন, ‘আমি শেষ ঢাকা অ্যাটাকে কাজ করেছি, তার পরবর্তীতে আমি কোথা থেকে টাকা পাব? তো যেটা হয়, আশেপাশের মানুষের এক্সপেকটেশন বেড়ে যায়। আমাদের দেখলে দোকানদাররাও দাম বাড়িয়ে দেয়। এটাও একটা প্রেসার।’

‘আমরা পাড়ায় যাই না, আমরা কাজ করতে যাই, আমরা সংস্কৃতিকর্মী, আমরা কাজের বিনিময়ে টাকা পাই। সব মেয়েই যে দেহ ব্যবসা করে, এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অন্যথায় আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জেনারেশনের সামনে দাঁড়াতে পারব না। ঠিক তেমনি কোনো ভালো পরিবারের মেয়ে অভিনেত্রী হিসেবে আসবে না।’

অভিনেত্রীদের নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে নওশাবা বলেন, ‘এই যে অভিনেত্রী শব্দটি এক ধরনের সম্মান, আবার এক ধরনের গালিও বটে। যারা সুচিত্রা সেনের ছবি প্রোফাইল পিকচারে রাখে, তারা আবার আমাকে গালি দিয়ে বলে, ধুর, তোমরা তো অভিনেত্রী, তোমরা তো নায়িকা। এই যে সমাজের একটি অদ্ভুত রূপ, সেই রূপের সঙ্গে প্রতিটি মেয়েকে প্রতিটি অভিনেত্রীকে প্রতিদিন ফাইট করতে হয়।’

[ad_2]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here