জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত, রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে ‘দায়মুক্তির ফাঁদ’ তৈরি হচ্ছে : টিআইবি

Jan 12, 2026 - 08:58
 0  4
জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত, রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে ‘দায়মুক্তির ফাঁদ’ তৈরি হচ্ছে : টিআইবি
ছবি : সংগৃহীত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অভিযোগ করেছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে না। সংস্থার মতে, শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হলেও এর বেশিরভাগে জুলাই সনদের মূল চেতনা উপেক্ষিত হয়েছে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মৌলিক দিকগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্কারের নামে তৈরি এই আইনি কাঠামো কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, টিআইবি ধারাবাহিকভাবে আইনের খসড়া পর্যালোচনা ও সুপারিশ দিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়ায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানালেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি। দুদক সংস্কারে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মার্জনার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ‘দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ’ হিসেবে তিনি আখ্যায়িত করেন।

দুদক অধ্যাদেশে কমিশনার সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী কমিশনার ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধে প্রস্তাবিত ইন্টিগ্রিটি ইউনিট বাতিল এবং পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়াকে গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। সাবেক আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য, ‘সদস্য সচিব’ পদ সৃষ্টি এবং প্রথম তিন বছরে অনির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুযোগ দেওয়া সিভিল ও পুলিশি আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব বজায় রাখার কৌশল হিসেবে কাজ করবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংস্কার অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, প্রাথমিক খসড়া আন্তর্জাতিক মানের হলেও সংশোধিত সংস্করণে সেই সম্ভাবনা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কমিশনের আওতায় আনার উদ্যোগ স্বাগত, কিন্তু কমিশনার নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

টিআইবি আশঙ্কা করছে, সংস্কার কমিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করলে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বদলে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে। জুলাই সনদের চেতনানুযায়ী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow