দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও মুশফিকের মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

Jan 13, 2026 - 14:46
 0  5
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও মুশফিকের মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
ছবি : সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা ও আখাউড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। মুশফিকুর রহমান নাকি কবীর আহমেদ ভূঁইয়া— কে হচ্ছেন দলের চূড়ান্ত প্রার্থী, এ নিয়ে দ্বিধায় দলের নেতা-কর্মীরা। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে মুশফিকুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। এছাড়া বয়সের ভারে নুব্জ্য হওয়ার স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আন্দোলন করে আসছেন।

এদিকে মুশফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ না করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তার নাগরিকত্ব ও মনোনয়নের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন একই আসনের গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী জহিরুল হক চৌধুরী।

সাম্প্রতিক তার ভ্রমণপথে ব্যবহৃত কানাডিয়ান পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া, হলফনামায় দেওয়া তথ্য এবং সরকারি নথির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে আপিল করেন জহিরুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, মুশফিকুর রহমান কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করেই বাংলাদেশে এসেছেন। অথচ তার হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি গত বছরের ২৫ আগস্ট কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সর্বশেষ বাংলাদেশে এসেছেন, যা সরকারি ইমিগ্রেশন নথিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ইমিগ্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী, মুশফিকুর রহমানের ব্যবহৃত পাসপোর্টটি ছিল কানাডিয়ান পাসপোর্ট (নম্বর: AS037031), নাম: Mushfi Qur Rahman, জন্ম তারিখ: ০৮-০১-১৯৪০। ভ্রমণ ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি ২০২৫ সালের ১ জুলাই দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসেন, পরে ২৮ জুলাই দেশত্যাগ করেন এবং একই বছরের ২৬ আগস্ট প্যারিস থেকে আবার বাংলাদেশে আসেন। এসব তথ্য থেকে সংশ্লিষ্টদের দাবি, মনোনয়ন দাখিলের আগেও তিনি কার্যত কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবেই যাতায়াত করেছেন।

এদিকে মুশফিকুরের হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘আমি কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি’। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো বৈধ প্রমাণ বা সমর্থনকারী নথি তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে জমা দেননি। ফলে তথ্য গোপনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয়রা জানান, এ আসনে প্রথমে দলের চেয়াপারসনের উপদেষ্টা মুশফিকুর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে জেলা বিএনপির সদস্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকেও মনোনয়ন দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। যাচাই-বাছাইয়ে দুইজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে মুশফিকুর রহমানের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে জোর আলোচনা চলছে।

এদিকে তবে দীর্ঘ দিন প্রবাসে থাকা কানাডার পাসপোর্টধারী মুশফিকুর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে প্রথম থেকেই দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে পাশে না থাকার অভিযোগ তোলে তার মনোনয়ন বাতিল করে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে দেওয়ার দাবি জানান কসবা ও আখাউড়া উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

এদিকে মনোনয়ন ইস্যুতে ইতোমধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে কসবা ও আখাউড়া উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মাঝে। গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরেই মুশফিকুর রহমানের দলের মনোনয়ন বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন না বেশির ভাগ নেতা-কর্মী। তার মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবি নিয়ে টানা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে কসবা ও আখাউড়া উপজেলা বিএনপির বড় একটি অংশ।

নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলগুলোতে মুশফিকুর রহমান কানাডায় ছিলেন। নেতা-কর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হলেও তিনি কাটিয়েছেন আয়েশি জীবন। অন্যদিকে দলের দুঃসময়ে জেলা বিএনপির সদস্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়া নেতা-কর্মীদের জন্য নিবেদিত ছিলেন এবং কারান্তরীণ নেতা-কর্মীদের নিজ খরচে জামিন করিয়েছেন বলে দাবি হামলা-মামলার শিকার নেতা-কর্মীদের।

তবে শুধু দল এবং কর্মীদের দুর্দিনে পাশে না থাকার অভিযোগই নয়, মুশফিকুর রহমানের দ্বৈত নাগরিক্ত নিয়েও বিব্রত দলের বড় অংশের নেতা-কর্মীরা। গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি কানাডার পাসপোর্টেই বাংলাদেশে ফিরেছেন। যদিও হলফনামায় তিনি কানাডিয়ান নাগরিকত্ব ত্যাগ করে পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্যমতে, সর্বশেষ গত বছরের ২৫ আগস্ট কানাডিয়ান পাসপোর্টে দেশে আসেন মুশফিকুর রহমান। কানাডিয়ান সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে ১১-১৬ মাস পর্যন্ত। তবে হলফনামার তথ্যানুযায়ী মুশফিকুর রহমান গত বছরের ২১ ডিসেম্বর কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। মূলত কানাডার সরকার Certificate of Renunciation না দিলে কেউ নাগরিকত্বহীন হিসেবে গণ্য হন না। এছাড়া এই সনদের একটি সত্যায়িত কপি অন্য দেশের নির্বাচনি কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হয়। ফলে মুশফিকুর রহমানের কানাডিয়ান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক স্বপন বলেন, ‘মুশফিকুর রহমান দীর্ঘ দিন বাংলাদেশে ছিলেন না। ২০১৩ সালে দেশ থেকে চলে যান। এরপর ২০১৮ সালে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। এবারও তিনি গণঅভ্যুত্থানের পর কানাডা থেকে দেশে এসেছেন। এর আগে তার কোনো খবর ছিল না। আমাদের সঙ্গে ছিলেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি মাঠে ছিলেন, গুম হয়েছিলেন। মুশফিকুর রহমান এখনও কানাডার নাগরিক। তাকে যদি চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়, তাহলে এই আসনটি বিএনপি রক্ষা করতে পারবে না।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুশফিকুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল মনসুর মিশন বলেন, ‘মুশফিকুর রহমান সারা বছর দেশেই থাকেন। তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এখন দ্বৈত নাগরিক্ত নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow