ছুটির দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মানুষের ঢল, খুশি ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা
রাজধানীর উপকণ্ঠ রূপগঞ্জের পূর্বাচলে ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছিল ব্যাপক ভিড়। বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে এ মেলায় সকাল থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর গড়াতেই মেলা প্রাঙ্গণে নামে জনস্রোত। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এতে বিক্রেতাদের মুখেও ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি।
প্রতিবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে কসমেটিকস, পোশাক, গৃহস্থালির তৈজসপত্র ও ক্রোকারিজ পণ্যের স্টলগুলোতে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাবারের স্টলেও ছিল সরব উপস্থিতি। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে। দর্শনার্থীদের কেউ খুঁজছেন ঘর সাজানোর সামগ্রী, কেউ নিজের জন্য প্রসাধনী কিংবা পোশাক। তরুণদের পাশাপাশি শিশু ও বয়স্কদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
সারাদিন স্টল ঘুরে ঘুরে পছন্দের পণ্য কিনছেন ক্রেতারা। কেউ ব্যস্ত ছবি তুলতে, কেউ আড্ডায় মেতে উঠেছেন। আবার কেউ সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ফার্নিচার কিনছেন। ছাড় ও বিশেষ অফারের খোঁজে অনেককেই এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ছুটতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এমন ভিড়ে বেচাকেনাও জমে উঠেছে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে চব্বিশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ স্কয়ার’-এ। এ ছাড়া কারাবন্দিদের হাতে তৈরি দেশীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের পণ্য ঘিরেও ছিল আগ্রহ। এসব পণ্য দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
শিশুদের বিনোদনের জন্য আলাদা শিশু পার্কে প্যাডেল বোট, নাগরদোলা, ট্রেন, নৌকা, হেলিকপ্টার, স্লিপারসহ নানা রাইডে চড়ে আনন্দে সময় কাটাতে দেখা গেছে ছোটদের। এদিকে হাজী বিরিয়ানি, তুর্কি রেস্টুরেন্ট, মিঠাই, ঝটপট, টেস্টি ট্রিটসহ বিভিন্ন খাবারের স্টলে ভোজনপ্রেমীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়।
আরএফএল, প্রাণ, দুরন্ত বাইসাইকেল, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি পোশাক ব্র্যান্ড, ঢাকাই জামদানি, শীতের চাদর, জুতা, গৃহস্থালি সামগ্রী, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, মোটরসাইকেল, স্কুটি ও অ্যালুমুনিয়াম সামগ্রীসহ নানা পণ্যে সাজানো প্যাভিলিয়ন ও স্টলগুলো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ছোট পণ্য থেকে শুরু করে ভারি সামগ্রী এক জায়গায় পাওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা।
সাওঘাট এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী সেলিনা পারভীন বলেন, ‘ছুটির দিন থাকায় পরিবার নিয়ে মেলায় আসা হয়েছে। সবার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করেছি। মেলায় পণ্যের বৈচিত্র্য বেশ ভালো।’
সিলেট থেকে আসা দর্শনার্থী আব্দুর রহমান বলেন, ‘রাস্তায় উন্নয়নকাজ চলার কারণে আসতে একটু কষ্ট হয়েছে। তারপরও মেলায় এসে ভালো লাগছে। প্রতি বছরই এখানে আসি।’
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী রুনা খান বলেন, ‘বাংলাদেশ স্কয়ার ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এক জায়গায় দেখে আবেগী হয়ে পড়েছি। পাশাপাশি কারাবন্দিদের হাতে তৈরি দেশীয় হস্তশিল্প দেখে কিছু পণ্য কিনেছি।’
দর্শনার্থীরা জানান, খোলামেলা পরিবেশে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরা ও কেনাকাটা করা যাচ্ছে। তাদের মতে, আগের বছরের তুলনায় এবার পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য আরও উন্নত।
মেলা কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের বাণিজ্য মেলায় ৩২৪টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভারত, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়ার ১১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। ৩ জানুয়ারি শুরু হওয়া মেলা চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রবেশ মূল্য বড়দের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, জুলাই আন্দোলনে আহত ও প্রতিবন্ধীরা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবেন।
মেলার অপারেশন ইনচার্জ এস এম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শৈত্যপ্রবাহের কারণে প্রথম কয়েক দিন দর্শনার্থী কম ছিল। ষষ্ঠ দিনে প্রায় ১৮ হাজার দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল। তবে প্রথম শুক্রবারে অর্ধ লাখের বেশি মানুষ মেলায় এসেছেন।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (গ সার্কেল) মেহেদী হাসান বলেন, ‘ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি থাকায় আগে থেকেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৯০০ পুলিশ সদস্য ও আনসার মোতায়েন রয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতও সার্বক্ষণিক কাজ করছে। এ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
What's Your Reaction?

