শীতে রুম হিটার আরামদায়ক নাকি অনিরাপদ?

Jan 5, 2026 - 19:48
 0  5
শীতে রুম হিটার আরামদায়ক নাকি অনিরাপদ?
ছবি : সংগৃহীত

কনকনে ঠাণ্ডার সঙ্গে পাল্লা দিতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে নানা রকম উষ্ণতার আয়োজন। ভারী লেপ–কম্বল, উলের পোশাকের পাশাপাশি শহুরে জীবনে শীতের আরামের সঙ্গী হয়ে উঠেছে রুমহিটার। যার এক ক্লিকেই ঘরের ভেতর উষ্ণতা, ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া শরীর মুহূর্তে স্বস্তি পায়। কিন্তু এই আরামের আড়ালেই কি লুকিয়ে আছে কিছু ঝুঁকি?

শীতে রুম হিটার কি সত্যিই নিরাপদ, নাকি অজান্তেই আমরা ডেকে আনছি বিপদ?

আরামের কারণেই জনপ্রিয়

রুম হিটারের জনপ্রিয়তার মূল কারণ এর তাৎক্ষণিক আরাম। শীতকালে শরীরের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। রুম হিটার ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শরীরকে স্বস্তি দেয়। বিশেষ করেবয়স্ক মানুষ, ছোট শিশু, শীত-জনিত জয়েন্ট পেইন বা বাতের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের কাছে এটি যেন আশীর্বাদ। রাতে কাজ করা মানুষ বা পড়াশোনায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের কাছেও রুম হিটার মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্যকরে।

শুষ্ক বাতাসে বাড়ে শারীরিক অস্বস্তি

দীর্ঘ সময় রুম হিটার চালু থাকলে ঘরের বাতাস দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে শরীরের ওপর। সবচেয়ে বেশি ভোগে ত্বক। শীতে এমনিতেই ত্বক শুষ্ক থাকে, তার ওপর রুম হিটারেরগরম বাতাস ত্বককে আরও রুক্ষ করে তোলে। ঠোঁট ফেটে যাওয়া, চুলকানি, ত্বকে লালচে ভাব—এসব সমস্যা অনেকের কাছেই পরিচিত। চোখে জ্বালা, শুষ্কতা কিংবা পানি পড়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শ্বাসযন্ত্রের ওপর প্রভাব

রুম হিটারের আরেকটি বড় ঝুঁকি শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা। শুষ্ক বাতাস নাক ও গলার ভেতরের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়, ফলে সর্দি-কাশি, গলা খুসখুস বা নাক বন্ধের সমস্যা বাড়ে। যাদের অ্যাজমা, অ্যালার্জি বা সিওপিডির মতোশ্বাসকষ্ট-জনিত রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে রুম হিটার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। কিছু হিটার ব্যবহারে কার্বন মনোক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয়, যা বন্ধ ঘরে জমে গিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্য-ঝুঁকি তৈরিকরতে পারে। মাথা ঘোরা, বমি ভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি—এসব লক্ষণ অনেক সময় আমরা গুরুত্ব দিই না, অথচ তা হতে পারে বিপদের পূর্বাভাস।

আগুন লাগার আশঙ্কা

শীতকালে ঘরে আগুন লাগার অন্যতম কারণ হিসেবে রুম হিটারকে দায়ী করা হয়। পর্দা, কম্বল, বিছানার চাদর কিংবা কাপড়ের খুব কাছাকাছি হিটার রাখলে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময়হিটার চালু রেখে দিলে বিপদ আরও বাড়ে। অনেক দুর্ঘটনার পেছনে থাকে সামান্য অসতর্কতা—একটু দূরে না রাখা, পুরনো তার বা নিম্নমানের হিটার ব্যবহার করা।

শিশু ও বয়স্কদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে রুম হিটার ব্যবহারে আলাদা সতর্কতা প্রয়োজন। শিশুদের ত্বক ও শ্বাসনালী অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতিরিক্ত গরমে তারা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে বয়স্কদের শরীর তাপমাত্রানিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক ধীর, ফলে গরম-ঠাণ্ডার ভারসাম্য নষ্ট হলে সমস্যা দেখা দেয়। সরাসরি গরম বাতাস শরীরে লাগলে ডিহাইড্রেশন বা মাথা ঘোরা দেখা দিতে পারে।

বিদ্যুৎ খরচ ও পরিবেশ ভাবনা

রুম হিটার ব্যবহারের আরেকটি দিক হল বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ। শীতকালে দীর্ঘ সময় হিটার চালু থাকলে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যায়, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চাপের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎব্যবহার পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—এই বিষয়টি আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি।

নিরাপদ ব্যবহারে কমবে ঝুঁকি

রুম হিটার পুরোপুরি বাদ দেওয়া অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। তবে সচেতন ব্যবহারে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। দীর্ঘ সময় একটানা হিটার চালু না রেখে বিরতিদেওয়া ভালো। রাতে ঘুমানোর সময় হিটার বন্ধ রাখা সবচেয়ে নিরাপদ। দাহ্য বস্তু থেকে অন্তত কয়েক ফুট দূরে হিটার রাখা উচিত। ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে পানি ভর্তি পাত্র বা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতেপারে।

বিকল্প ভাবনাও জরুরি

রুম হিটারের পাশাপাশি গরম পোশাক, মোজা, শাল বা লেয়ারিং পদ্ধতিতে পোশাক পরা স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প হতে পারে। সকালের রোদে কিছুক্ষণ থাকা, গরম পানীয় পান করা কিংবা ঘর সঠিকভাবে বন্ধ রেখে তাপ ধরেরাখাও শীত মোকাবিলায় কার্যকর।

রুম হিটার শীতের আরামে বড় ভূমিকা রাখে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে অতিরিক্ত নির্ভরতা ও অসচেতন ব্যবহার একে আরামের বদলে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। শীতের উষ্ণতা উপভোগ করাই লক্ষ্য, কিন্তু তা যে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে না হয়। সচেতন থাকলেই রুম হিটার হবে কেবল আরামের।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow